দেবশ্রী ভট্টাচার্য- দুর্গা দেবী না মানবী

Posted: September 17, 2014 in আশ্বিন ১৪২১, প্রবন্ধ

দেবশ্রী ভট্টাচার্য

দুর্গা দেবী না মানবী

 

 

আর কিছুদিন বাদেই দুর্গা পূজা। প্রকৃতির গ্রিনরুমে শেষ সময়ের প্রস্তুতি চলছে।প্রস্তুতি চলছে কুমোরটুলির পটুয়াদের ঘরেও । প্রস্তুতি চলছে গড়িয়াহাটের ফুটপাথে, নামিদামি শপিংমলে , প্রস্তুতি চলছে আমাদের অন্তরে। কিন্তু কার জন্য এই আয়োজন? এক দেবীর জন্য? যার দশটা হাত তিনটে চোখ! যে কোন এক কালে সিংহের পিঠে চেপে দুর্দান্ত মহিষাসুরকে বধ করে ছিল।মোটেই না, বাঙালি চিরকালের শান্তিপ্রিয় নরম স্বভাবের মানুষ। ওসব যুদ্ধ-টুদ্ধ তার বিশেষ পোষায় না।দুর্গা পূজা বাঙালির কাছে এক দুঃখী মেয়ের মাত্র তিনদিনের জন্য বাপের বাড়ি আসা, কিছুদিনের জন্য একটু আনন্দে থাকা, সবাইকে আনন্দে রাখা, তারপর আবার ফিরে যাওয়া সেই সুদুর কৈলাসে যেখানে এক বুড়ো বর আর তার ছন্নছাড়া সংসার অপেক্ষা করে আছে তার জন্য।

চর্যাপদের যুগ থেকেই বাঙলা সাহিত্যের একটা রীতি হল আপাত নিরীহ সাদামাটা কথার আড়ালে ধর্মের কথা আলোচনা করার।মা দুর্গাকে নিয়ে যা যা লেখা হয়েছে বিশেষত শাক্ত পদাবলীর আগমনী- বিজয়া পর্যায় তাও মুলত সনাতনী ধর্মকেই ইঙ্গি্ত করেছে।শক্তিকথাকে অবলম্বন করেই শাক্ত পদাবলী।শাক্ত কবিরা  বিভিন্ন পদের মাধ্যমে শক্তি কথাকেই তুলে ধরেছেন।এখানের আরাধ্যা দেবী উমা হলেন সেই দেবী দুর্গা যে মধু কৈটভকে দমন করেছিলেন, চণ্ড মুণ্ডকে বিনাশ করেছিলেন , মহিষাসুরকে বধ করেছিলেন, রক্তবীজের রক্ত পান করেছিলেন। শিব হলেন আদি দেব তাই তাঁকে বারবার বৃদ্ধ বলা হয়েছে। তিনি শ্মশানবাসী তাই তাঁর সংসারের এই হাল! সে যাই হোক সেগুলো তো আড়ালে আছে। আর ওপরে যে মোড়কটা আছে তা হল নিতান্তই পাশের বাড়ির একটি দুঃখী মেয়ের করুণ কাহিনী।বাঙালী কবি চিরকাল বিশ্বাস করে এসেছে-“অরসজ্ঞ কাক চোষে জ্ঞান নিম্বফল,

রসজ্ঞ কোকিল খায় প্রেমাম্র মুকুল”

  • কৃষ্ণদাস কবিরাজ

কোন সাহিত্য ছাড়া জ্ঞানের কথা তার কাছে নিমের মতোই তেঁতো।অষ্টাদশ শতকের এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতে শাক্ত পদাবলীর সূচনা। একদিকে তখন মোঘল শাসনের সূর্যাস্ত অন্যদিকে ইংরেজ শাসনের সূর্যোদয়।এই সময় দাঁড়িয়ে সাধারন মানুষ এমন এক ভয়ঙ্করী দৈবী শক্তির আরাধনায় মগ্ন হল যিনি তাদের এই সঙ্কটের হাত থেকে মুক্ত করতে পারবেন। দশহাতে দুষ্ট দমন করবেন।কিন্তু বাঙালি কবিগণ হলেন মধুর রসের উপাসক। তাই তাঁরা কোন দেবীর আরাধনা করলেন না, করলেন মায়ের আরাধনা, মেয়ের আরাধনা।

শাস্ত্রে ঈশ্বর আরাধনার ক্ষেত্রে পাঁচটি রসের কথা বলা হয়েছে  –ঐশ্বর্য রস, দাস্য রস, সখ্য রস, বাৎসল্য রস এবং মধুর রস।ষোড়শোপচারে যে পূজা করা হয় ,তা হল ঐশ্বর্য রসের সাধনা। ভক্ত আর ভগবানের দূরত্ব সেখানে অনেকখানি। দাস্য রসের সাধনায় ভগবান প্রভু ভক্ত তার অনুগত ভৃত্য । এখানে ব্যবধান খানিক কমেছে। হনুমানের সাধনা হল দাস্য রসের সাধনা। সখ্য রসে ভক্ত আর ভগবান বন্ধুত্বের বন্ধনে আবদ্ধ। শ্রীদাম, সুদাম প্রভৃতি কৃষ্ণের বাল্য সখাদের সাধনা হল সখ্য রসের সাধনা । বাৎসল্য রসে  ভগবান হল সন্তান আর মধুর রসে সে হল ভক্তের প্রেমিক। এই দুই রসেই ভক্ত আর ভগবানে কোন ব্যবধান থাকে না। তাই এই রসের সাধনাকেই বাঙালি সাধক কবিরা মেনে নিয়েছিলেন। বৈষ্ণবদের পছন্দ ছিল মধুর রস আর শাক্তদের বাৎসল্য রস।

শাক্ত পদাবলীর আগমনী – বিজয়া পর্যায়ের আরাধ্যা দেবী হলেন দেবী দুর্গা । তবে তাঁর দৈবী মহিমা , তাঁর শক্তি অন্য সকলের জন্য, মা মেনকার কাছে তিনি আদরের দুলালি ছোট্ট মেয়ে উমা। যাকে সমাজ সংসারে মান রাখতে গিয়ে সেই কোন আট বছর বয়সে বিয়ে দিয়ে দিতে হয়েছিল এক বুড়ো বরের সঙ্গে।মেনকা বিশ্বাসই করতে পারে না তার মেয়ের দৈবী গুণের কথা! ঘোর অবিশ্বাসের সঙ্গে প্রশ্ন করে ‘শুনেছি উমা নাকি আমার অসুর মেরেছে!’ তার উমা তো এসব কিছু করার কথা ভাবতেই পারে না। নিজের সংসার সামলাতেই তো সে সদা ব্যস্ত।  ঘরে তাঁর আবার গঙ্গা নামে এক সতীন আছে।  সে আবার তাঁর স্বামীর বড় প্রিয়। শিব সর্বদা তাকে মাথায় করে রাখেন।  এসব না হয় বাদই দেওয়া গেল, কিন্তু সংসারের ব্যাপারেও তিনি ভীষণ উদাসীন। ভিক্ষা করে সংসার চলে। সেটুকুও আবার উমার তাড়না না হলে সম্ভব হয় না। সংসারটা তো নেহাত কম নয় । মুকুন্দরাম দেখিয়েছেন সেই চিত্র। অর্থের টানাটানি তো আছেই, তার ওপর রয়েছে বাহনদের নিয়ে অশান্তি। দেবীর সিংহ শিবের ষাঁড়কে দেখলেই তেড়ে যায়। কার্তিকের ময়ূর শিবের সাপের দিকে সর্বদা লোলুপ দৃষ্টি দিয়ে রেখেছে। লক্ষ্মীর প্যাঁচা গণেশের ইঁদুরকে ধরবার জন্য ব্যস্ত। একা উমা কত দিক আর  সামলান। এজন্যই বুঝি তাঁর দশ হাতের প্রয়োজন। এইকারনেই ‘হেমাঙ্গি হইয়াছে কালির বরণ’ ।এই সংসার  থেকে ছুটি নিয়ে বছরে মাত্র তিনদিনের জন্য তাঁর বাপের বাড়ি আসা।  আসার সময় আবার অঙ্গীকার করে আসতে হয়  ‘আসিবো প্রভাতে, নবমী পোহাতে’। মেনকা তাই বারবার অনুরোধ করে ‘ওরে নবমী নিশি না হইও অবসান’। তবু সেই পাষাণী নবমী নিশি মায়ের অবুঝ ব্যথা না বুঝেইএকসময় শেষ হয়ে যায়।আর তার পরেই দরজায় শিবের ডমরু শোনা যায়।

এই আমাদের পুজো। চোখের জল দিয়ে তাঁকে ভিজিয়ে তাঁর দৈবী মহিমার সবটুকু নিঙরে তাঁকে মানবী করে তোলাই আমাদের পুজোর মন্ত্র । আজো তাই বাঙালি মায়েরা সিঁদুর খেলার সময় দেবীকে সিঁদুর দিয়ে মুখে পান, মিষ্টি দিয়ে তাঁকে ‘আবার এস’ বলে বিদায় জানায়। বিদায় জানায় কোন দেবীকে নয় , তাদের ঘরের মেয়েকে। রবীন্দ্রনাথ বৈষ্ণব পদাবলীর ক্ষেত্রে বলেছিলেন-“প্রিয়জনে যাহা দিতে পারি, দিই তাই দেবতারে।

আর পাবো কোথা?

দেবতারে প্রিয় করি, প্রিয়েরে দেবতা”।

শাক্ত পদাবলীর ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায় । দেবী আমাদের মা, সেই মা, যার কাছে নির্দ্বিধায় সমস্ত আবদার অভিযোগ করা যায়। সন্তানের মঙ্গলের জন্যই তো তাঁর এই অসুর দলন। আর সেই অসুরও তো তারই সন্তান! শাক্ত কবিরা সে প্রশ্নও তাঁকে বার বার করেছে। তিনি না জগজ্জননী , মহিষাসুরও তো তাঁরই সন্তান ! তিনি কী করে পারলেন তাঁকে এইভাবে বধ করতে? নিজের চরম শত্রুকেও এমন ক্ষমার চোখে দেখতে বোধহয় শুধু বাঙালি কবিরাই পারেন। কিন্তু দেবী কী করবেন? তিনি যে মা! প্রয়োজনে তাঁকে যে কঠোরও হতে হয়! মার্কণ্ডেয় পুরাণে আছে যে মহিষাসুর তার অন্তিম সময়ে যখন দেবীকে চিনতে পারলো , যখন তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করলো তখন দেবী অবলীলায় তাঁকে ক্ষমা করলেন। শুধু তাই নয় তিনি আশীর্বাদ করে বললেন “আজ থেকে তোমার নাম আমার নামের আগে উচ্চারিত হবে। অর্থাৎ আমি পৃথিবীতে  মহিষাসুরমর্দিনী রূপে পূজিত হব। যেখানে যেখানে আমার পূজা হবে সেখানে সেখানে তোমারও পূজা হবে”। নিজে পিছিয়ে পড়ে সন্তানকে এগিয়ে দিতে তো এক মা –ই পারে।

আমরা বাঙালিরা এই মা –কেই পুজো করি। সারা বছর ধরে আমরা এই তিনটে দিনের জন্য ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করি । শরতের আকাশ যখন সাদা হয়ে ওঠে ,গাছে,গাছে যখন শিউলি ফুলে ভরে ওঠে ,মাঠে মাঠে যখন কাশ ফুলে ছেয়ে যায় , আমাদের মনও তখন আমাদের মাকে দেখার জন্য আকুল হয়ে ওঠে  ।মেনকার মতো আমারাও যেন আমাদের মনকে তাড়না দিই। বারবার বলি ‘যাও যাও গিরি আনিতে উমারে’।  শুধু তিনটে দিন নয় , পুরো বছরটা তাঁকে আমাদের হৃদয়ে বেঁধে রাখতে চাই। তিনি তো কোন দেবী নন , তিনি আমাদের একান্ত আপনার জননী ।

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s