সৈয়দ মাজহারুল পারভেজ-ভালোবাসা

Posted: September 18, 2014 in আশ্বিন ১৪২১, ওয়েবজিন, গল্প

সৈয়দ মাজহারুল পারভেজ

 

ভালোবাসা

 

 

পাথরঘাটা থেকে ঢাকায় ফিরছিল রুদ্র শায়ক । স্টিমারে । ভোর সাড়ে পাঁচটায় ছেড়েছে, সন্ধ্যে নাগাদ সদরঘাটে পৌঁছে যাবে । সারাদিন কেবিনে শুয়ে-বসে, বই পড়ে-টিভি দেখে বোর হয়ে যাচ্ছিল । এসি কেবিন হওয়ায় কিছুটা রক্ষে । যে গরম পড়ছে, এসি না থাকলে সেদ্ধ হয়ে যেত ।

স্টিমার চাঁদপুর ছেড়ে এসেছে অনেক আগে । মেঘনার পশ্চিমাকাশ রবির রক্তিম আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠছে । আর একটু পরেই সন্ধ্যে নামবে । কেবিন থেকে বাইরে এলো রুদ্র । ডেক-এ রেলিং এ ভর করে দাঁড়ালো । সামনে তাকালো । শুধুই অথৈ পানি । সীমাহীন ।

কতদিন পর আবার মেঘনার খোলা হাওয়ায় নিজেকে মেলে দিলো । কত হবে? তা হবে দু’যুগ তো হবেই । তার মানে চব্বিশটা বছর পর আবার সেই মেঘনার উন্মুক্ত ডেক এ দাঁড়িয়ে খোলা আকাশের দিকে দু’চোখ ভরে তাকানো, বুক ভ’রে নিঃশ্বাস নেয়া ।

চব্বিশ বছর আগে শেষবার এই স্টিমারে ঢাকা থেকে আমতলি গিয়েছিল রুদ্র । সেবার ওর পাশে ছিল শ্রেয়শী । ওর ক্লাশমেট । যাকে ও মন-প্রাণ উজাড় করে ভালোবেসেছিল । বিয়ে করবে বলে ঠিকও করে ফেলেছিল ।

মাস্টার্স পরীক্ষা শেষ । কথা ছিল, গ্রামের বাড়ি থেকে ফিরে ওরা রেজিস্ট্রিটা করে রাখবে । তারপর একটা চাকরি-বাকরি জুটে গেলে ছোট্ট সুখের নীড় বাঁধবে । তারপর ওরা শুধুই দুজন দুজনার ।

শ্রেয়শীকে আমতলি পৌঁছে দিয়ে পাথরঘাটা গেল রুদ্র ।  সপ্তাহ খানেক গ্রামে থেকে ঢাকায় ফিরে চাকরি খুঁজতে লেগে গেল । যে করেই হোক ওকে একটা চাকরি জোগাড় করতেই হবে । নইলে ওর জীবনের সব স্বপ্ন তছনচ হয়ে যাবে ।

ওদিকে শ্রেয়শী সেই  যে বাড়ি গেছে  আর ফেরার নাম নেই । দিন গেল, সপ্তাহ গেল; মাস গেল শ্রেয়শী আর ঢাকায় ফিরলো না । চিঠি লিখলো রুদ্র । উত্তর এলো না । শ্রেয়শীর বিরহে পাগল-প্রায় হয়ে উঠলো রুদ্র ।

একদিন মতিঝিল অফিস পাড়ায় বন্ধু হাসান মাসুদের সাথে দেখা । মাস্টার্স করে ওর মতোই  চাকরি খুঁজছে । হাসান মাসুদের কাছে জানলো, শ্রেয়শীর বিয়ে হয়ে গ্যাছে । স্বামীর সাথে চিটাগাং থাকে । শ্রেয়শীর হ্যাজবেন্ড চিটাগাং  য়্যুনির্ভাসির্র্টির টিচার ।

শুনে মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো রুদ্রর । এ জন্যে বুঝি ওর চিঠিরও কোন উত্তর দ্যায় না । চাকরি খোঁজা বন্ধ হলো । বাসা থেকে বের হওয়া বন্ধ করলো । রাগে-ক্ষোভে-অপমনে তাবৎ বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন; বাইরের পৃথিবীর সাথে সব সম্পর্ক ছেদ করে দিলো ।

হঠাৎ করেই য়্যুরোপ যাওয়ার একটা সুযোগ পেয়ে গ্যালো রুদ্র । ফিনল্যান্ডে । সুযোগটা হাতছাড়া করলো না । শ্রেয়শীহীন এ শহর ওর আর ভাল্লাগছিল না । তারচে’ এই ভালো । এই শহর, এই দেশ, বন্ধু-বান্ধব; আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে চলে যাবে দূরে, বহু দূরে । যেখানে কেউ ওকে চিনবে না । চেনা পৃথিবীর সাথে আর কোন সম্পর্ক থাকবে না ।

একদিন সত্যি সত্যি চলেও গ্যালো সেই সুদূর ফিনল্যান্ডে । তারপর কেটে গ্যালো একে একে চব্বিশটা বছর । চব্বিশ বছর পর এই প্রথম দেশে ফেরা ।

ওর পাশে একজন ভদ্র মহিলাও রেলিং এ ভর দিয়ে দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে রবির অস্ত গমন দেখার অপেক্ষায় উন্মুখ । ভদ্র মহিলার পুরো মুখটা দেখা যাচ্ছে না । মুখের একপাশ দেখতে পাচ্ছে রুদ্র । অনেকটা শ্রেয়শীর মতো । বুকের ভেতোরটা মোচড় দিয়ে উঠলো । না, ও নাম আর মনে করতে চায় না । চোখ ফিরিয়ে নিলো ।

চোখ আর মন তো কারো শাসন মানে না । আবার তাকালো । এবার ওর দিকে তাকালেন ভদ্র মহিলা । রুদ্র দেখলো, শ্রেয়শীর মতো নয়; শ্রেয়শীই । চব্বিশ বছর পরও ওকে চিনতে এতটুকু কষ্ট হলো না । সেই একই রকম আছে । রূপটা ঠিক ধরে রেখেছে ।

নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না । প্রতিজ্ঞা করেছিল, জীবনে আর কোনদিন ওর মুখ দেখবে না । নিজের প্রতিজ্ঞা নিজেই ভঙ্গ করলো ।

মনে ভয়-সংশয়, দ্বিধা-সংকোচ নিয়ে শ্রেয়শীর দিকে এগিয়ে গ্যালো রুদ্র । বললো : তুমি!

শ্রেয়শী ওকে আগেই দেখেছিল । এ জন্যে একটুও চমকালো না । উত্তর দিলো : চিনতে পারছো না, নাকি চিনেও না চেনার ভান করছো ?

না, মানে তোমার সাথে আর কেউ নেই তো, তাই ।

আর কেউ মানে ?

তোমার স্বামী, সন্তানেরা ।

বিয়ে হলেই না স্বামী-সন্তান ।

তাহলে হাসান মাসুদ যে আমাকে বলেছিল………

মাসুদ তো আমকেও বলেছিল, তুমি নাকি বিয়ে করে বউ নিয়ে বিদেশে চলে গ্যাছো । আমি তো ওর কথা বিশ্বাস করিনি ।

তার মানে তুমি বিয়ে করনি ?

ক্যানো, তুমি পারো আমি পারি না ? ভালোবাসার সোল এজেন্সি কী তুমি একাই নিয়েছো নাকি ?

শ্রেয়শীর এ কথার কোন উত্তর দিতে পারলো না রুদ্র । অপলক নয়নে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো একরাশ স্নিগ্ধ মুগ্ধতায়। তখন সূযটা লাল হতে হতে তলিয়ে যাচ্ছে মেঘনার নীল জলে । মেঘনার জলোচ্ছ্বাসের মতোই ওদের হৃদয়ের দু’ কূল ছাপিয়ে আছড়ে পড়ছে প্রণয়ের জলোচ্ছ্বাস । তখনও রুদ্র মুগ্ধ চোখে চেয়ে আছে শ্রেয়শীর মুখের দিকে । পলকহীন চোখে ।

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s