দণ্ডিতের সাথে-ডাঃ সুপ্তেন্দ্রনাথ সর্বাধিকারী

Posted: October 23, 2014 in ওয়েবজিন, কার্ত্তিক ১৪২১, রম্য রচনা

photo. Dr. Supten Sarbadhikari

দণ্ডিতের সাথে

স্বাস্থ্যকেন্দ্রের বা হেলথ সার্ভিসের ডাক্তারকে যে রোগী অজ্ঞান করা থেকে মড়াকাটা অবধি সবকিছুই করতে হয় সেটাতো বনফুল একাধিক গল্পে বাংলা সাহিত্যপ্রেমীদের জানিয়েছেন এবং সেই অভিজ্ঞতার ভাগ পেয়ে আমরাও ধন্য হয়েছি।আবার ডাক্তারের সামনে জমিদার এবং দরিদ্রতম প্রজাও সমান কাতরতা নিয়ে উপস্থিত হন| অন্যদিকে আবার পুলিশ তথা বিচারব্যবস্থার সঙ্গেও ডাক্তারদের একইরকম দহরম মহরম| সুতরাং ন্যায় অন্যায় প্রাণদান প্রাণনাশের ক্ষমতা যাদের আছে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিরও কিছু মিল তো থাকতেই পারে|

এই গল্প একজন বিচারকের| ধরুন আমিই সেই ডাক্তার যে প্রায় বছর সাতেক আগে পোস্ট মর্টেম করেছিল এক ভদ্রমহিলার| তাতে মৃত্যু পরবর্তী পোড়া ছাড়া আর বিশেষ কিছুই পাইনি আমি| এতদিনে মামলা উঠেছে আদালতে – অগত্যা সাক্ষী দিতে গেছি কোর্টে|

পৌঁছে শুনি জজ সাহেব শুনানি মুলতুবি রেখেছেন – এবং একান্তে আমার সাক্ষাতপ্রার্থী| বুঝলাম “ডাল মে কুছ কালা”| সাধারণত সাক্ষ্য দেবার পরে জজ নিভৃতে ডাকলে কাটিয়ে দেওয়া যায় – কাজ আছে বলে – সই সাবুদ পরে হবে| কিন্তু এখনো আমার সাক্ষ্য দেওয়া হয়নি তাই আদালত ছেড়ে যাবার কোনো উপায় নেই| ভাবলাম উনি যাই বলুন না কেন আমি আমার মতেই দৃঢ় থাকব|

ঘরে ঢুকতেই আমায় সাদর অভ্যর্থনা করলেন জজ সাহেব| “দেখুন ডাক্তারবাবু, আপনাকে প্রভাবিত করতে ডাকিনি, তবে আমার মনে হয় যে আপনার পুরো কেসটা জানা দরকার। আমি যা জানি এবং ভেবেছি সবই আপনাকে বলছি – তারপরে আপনি যা ভালো বুঝবেন তাই করবেন|”

“আমায় যা বলার অনুমতি দেবেন আদালতে তার বেশি তো বলতে পারবনা, তাছাড়া যাই বলিনা কেন আপনি তো তার গুরুত্ব নাও দিতে পারেন।”

“ঘটনাটা বছর সাতেক আগেকার। ভদ্রমহিলার ডেড বডি পাওয়া গেছলো ওনার বাড়ি থেকে মাইল তিনেক দুরে, আশেপাশে কেরোসিনের টিন বা দেশলাই বাক্স কিছুই ছিলনা। যদি ধরেও নেওয়া যায় আত্মহত্যা, ভদ্রমহিলা নিশ্চয়ই গায়ে আগুন লাগিয়ে তিন মাইল যাননি! আর এও নয় যে গায়ে কেরোসিন ঢেলে তিন মাইল গিয়ে তারপরে গায়ে আগুন ধরিয়েছেন। এছাড়াও কয়েকজন পড়শী সেই রাতে ওই ভদ্রমহিলা আর তার স্বামীর মধ্যে তুমুল ঝগড়ার আওয়াজ পেয়েছিলেন। সবচেয়ে বড় কথা হলো যে ওনাদের আট বছরের ছেলে আর পাঁচ বছরের মেয়ে ওই ঘটনার সাক্ষী যে ওদের বাবা ওদের মাকে গলা টিপে মেরে ফেলে গায়ে আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। এবং এই ঘটনার তারা লিখিত জবানবন্দিও দিয়েছে।”

“তাহলে তো এটা একটা  Open and shut case”|

“সেক্ষেত্রে আপনায় ডাকতাম না। সাত বছর বাদে এখন ছেলেটার বয়েস পনেরো আর মেয়েটার বয়েস বারো। ওরা দুজনেই জবানবন্দী অস্বীকার করছে আর বলছে যে তখন বাচ্চা ছিল তাই না বুঝেই সই করে দিয়েছে। আর প্রতিবেশীরা বলছেন যে পুলিশ ওদের ভয় দেখিয়ে ওদের থেকে জবানবন্দী আদায় করেছে।”

“তাহলে আপনি কি করতে চান?”

“আমি জানি লোকটা খুন করেছে – আর ফাঁসির হুকুম দিতে পারি। ছেলেমেয়েরা এখন অস্বীকার করছে সম্ভবত ভয়ে – যদি বাবা ওদেরও মেরে ফেলে, অথবা, মাকে তো হারিয়েইছে – আর বাবাকেও হারাতে চায়না। এবারে ভাবুন যদি ওদের বাবার ফাঁসি বা যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়, ওরা কিন্তু একেবারেই ভেসে যাবে – হয়তো anti-socials নয়তো ভিখিরী হবে – দুটো তাজা জীবন নষ্ট হবে অথছ যে গেছে সে তো আর ফিরে আসবেনা| আর যদি দৃষ্টান্ত হিসেবে ফাঁসির রায় দিই, আপনি কি মনে করেন যে অন্যরা তাই দেখে ভয় পাবে বা শিখবে? কখনোই না! ভাববে যে ও ম্যানেজ করতে পারেনি তাই ফেঁসে গেছে – আমি ঠিক বেরিয়ে যাব! হাঁ একটা বাজে জিনিস নিশ্চয়ই হবে, লোকটা ভাববে যে জজটাকে কেমন বুদ্ধু বানালাম! কিন্তু আশা করা যাই যে বাচ্চা দুটো অন্তত secured life পাবে এবং নিশ্চয়ই সুনাগরিক হবে|”

ভদ্রলোককে দেখে আমার মনে হলো কথাগুলো আন্তরিক – অন্য কোনভাবে প্রভাবিত হয়ে ওপর চালাকি করছেননা| বললাম “উকিলবাবু যদি জিজ্ঞেস করেন উনি পুড়ে মারা গেছেন কিনা – আমার উত্তর না-ই হবে – আর যদি জানতে চান যে গলা টিপে মারা হয়েছে কিনা সেটাও আমার পক্ষে বলা সম্ভব হবেনা| যদি সম্ভাবনার কথা উকিলবাবু জিজ্ঞেস করেন তাহলে আমাকে বলতেই হবে যা যা কারণ হতে পারে – সুতরাং আপনি ওই প্রশ্নে objection sustain করতে পারেন|” Circumstantial evidence-এর ব্যাপারে তো আমার কিছুই বলার নেই| তাই আপনি যতটুকু জানতে চাইবেন স্বতস্ফুর্তভাবে তার চেয়ে বেশি আমি কিছুই বলবনা। তারপরে তো সব আপনারই হাতে।”

“অনেক ধন্যবাদ ডাক্তারবাবু। মুশকিল কি জানেন, এই কথা কারো সঙ্গে আলোচনাও করতে পারবনা – ভুল বোঝার সম্ভাবনাও আছে অথছ রায় দেওয়ার আগে সবদিক ভালোভাবে দেখতে হয়। বাইরে আসামির উকিল বাহবা ও মোটা fees নেবে – বলবে কেমন দারুণ কেস সাজিয়েছি – একদম বেকসুর খালাস!”

ফেরার পথে ভাবছিলাম তাহলে শুধু আমরাই জীবন রক্ষা করিনা|

Advertisements
Comments
  1. […] ডাঃ সুপ্তেন্দ্রনাথ সর্বাধিকারী […]

  2. […] ডাঃ সুপ্তেন্দ্রনাথ সর্বাধিকারী […]

  3. Supratik Sen says:

    An engaging story written sincerely. To convert this into a short story, I would work more on the length. Please keep writing. I guess this can be converted into a script and tried as a film. These days films lack stories. I like the way you ended the story. Keep writing more and more.

  4. Satyabrata Acharya says:

    খুব REALISTICএকটি লেখা। বলা ভালো —এটি একটি জীবনদর্শন। একমাত্র একজন সুন্দর মনের আদর্শনিষ্ঠ মানুষই এরকম লিখতে পারেন।

  5. Ratul Lahiri says:

    Fantastic Supten. Keep up the good work. We are all there to give encouragement.

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s