মাতৃভাষা-রঞ্জন চট্টোপাধ্যায়

Posted: October 23, 2014 in ওয়েবজিন, কার্ত্তিক ১৪২১, গল্প

মাতৃভাষা

হারিকেনের আলোটা ঠিক কি, আমি তো বাবিকে বোঝাতে পারিনি। বলেছিলাম,  ‘বোতলের মধ্যে আলো’। বাবির মনঃপূত হয় নি।
‘বটল কে অন্দর আগ জ্বলেগা তো হিট নেহি হোগা ? বটল ফাট যায়েগা’।
বাবির এখন সি বি এস ই তৃতীয় শ্রেণী । পদার্থবিদ্যার বইটা এখনও বাবির নাগালের বাইরে। তাই বোঝাতে পারিনি, হারিকেন মানে একটি বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থা, যেখানে শীতল বায়ুর আগমন এবং উত্তপ্ত বায়ুর নির্গমনের ব্যবস্থা আছে। কাচ ফাটার কোন আশঙ্কাই তাই নেই।
আসলে বাবিকে আমি বোঝাতে চেয়েছিলাম, হারিকেন মানে মোলায়েম এক আলো। আলোর সামনে রাখা বই। বইয়ের ওপর দিয়ে বয়ে চলে যাওয়া আমাদের ছোটনদী। আলোর সামনের দেওয়ালে পড়া আমি, আমার ভাই আর মায়ের বড় বড় ছায়া।
হারিকেন মানে ফেলে আসা মায়ের স্নেহ। হারিকেন মানে হারিয়ে যাওয়া এক শৈশব। হারিকেন মানে,  এখনও  কষ্ট উসকে দেওয়া আমার অতিপ্রিয় গ্রামটির স্মৃতি।
ভাই পড়তে চাই তো না। বনে থাকে বাঘ। গাছে থাকে পাখি। মা তখন পিছনের ঝুমকো আমগাছের অন্ধকার দেখিয়ে বলতো, ‘দেখেছিস! পেতলচখি জ্বলছে।’ ভাই অন্ধকার আমগাছের দিকে ভয়ে গোল গোল চোখে তাকাত। সত্যি পেতলচখি জ্বলত ওখানে। ভায়ের শুধু অন্ধকারকেই ভয়  ছিল খুব। তাই মা অনেকদিন বলে নি, পেতলচখির অপরনাম জোনাকি।
বাবিকে বলছিলাম, হারিকেনের আলোয় আমি আমাদের ছোটনদী পড়েছি। আজ মঙ্গলবার। পাড়ার জঙ্গল সাফ করার দিন। কিংবা তিনটে শালিখ ঝগড়া করে রান্নাঘরের চালে – এসবও। হারিকেনের আলোতেই পড়া। খুব মজা ছিল তখন। গরমকালে সদ্য খেলে আসা ঘেমো পিঠ যখন হাওয়া লেগে শুকোতো, পড়তে পড়তেই হাত চলে যেত পিঠে। কখনও বা মশা। আলোর টানে চলে আসা সুড়সুড়ি পিঁপড়েগুলোও অকারণ পায়ে উঠে দুষ্টুমি করতো।
বাবিকে এসব কিন্তু বাঙলায় বলছিলাম না আমি। হঠাৎই মহানগরীতে লোডশেডিং হয়ে গেছে। কাঁপা কাঁপা মোমবাতির আলোর মতই আমার বাঙলাগুলোর হিন্দি আনুবাদ কেমন অগোছালো হয়ে কাঁপছে। বারবার আমি শৈশব ছুঁয়ে প্রৌঢ়ত্বে ফেরত আসছিলাম। যেন দোলনায় বসে দোল খেতে থাকা। এই উপর। এই নীচে। এই উপর …..। দুই ভাষাকে নিয়ে লোফালুফি করতে করতে আমার বলার ছন্দটাও কেমন হারিয়ে যাচ্ছিল। আমি কোন ভাষাটাই যেন ঠিক প্রকাশ করতে পারছিলাম না। বাবিকে বোঝাতে হচ্ছিল, আমাদের ছোটনদী মানে কি। পাড়ার হিন্দি অনুবাদ কি হতে পারে। আর শালিখকে হিন্দিতে কি নামে ডাকে। বললাম, ‘শালিখ মানে একরকমের পঞ্ছী। কাল সকালে সামনের টেলিফোন টাওয়ারে বসবে দেখবি’।
বাবিকে যখনই আমার শৈশব ব্যাখ্যা করতে যাই, অনুবাদের এই টানাপোড়েনে পড়ে যাই আমি। বাবিকে বোঝাতে পারিনা, যন্ত্রণা মানে দরদ্। কিন্তু ব্যাথা মানে কী। সকালকে হিন্দিতে বলে সুবা। সন্ধ্যেকে বলে সাম। কিন্তু বিকালকে কী নামে ডাকে। বাবি একদিন স্কুল থেকে ফিরে বলেছিল, ‘মেরেকো বহুত বদন দরদ্ হো রহা হ্যায়’। আমি ভেবেছিলাম, মুখে যন্ত্রণা হচ্ছে। বাঙলায় বদন মানে তো মুখ। বাবির মা বলল, ‘হিন্দিতে বদন মানে শরীর’। কপালে হাত রেখে বুঝেছিল, জ্বর আসছে।
আবার একদিন বাবি বলল, ‘আজ টিচার সতীশকো ডাঁটা। উসকা চেহরা উতার গিয়া’। আমি বাবিকে বোকার মত জিগ্যেস করেছিলাম, ‘সতীশের শরীরটা নিচে নেমে গেল কি করে’? বাবি অসহিষ্ণু হয়ে বলে উঠেছিল, ‘চেহরা! চেহরা! চেহরা মতলব ফেস’! অবলা জীবের মত বাবির দিকে বোবাচোখে তাকিয়ে ছিলাম আমি। বাবি আমার এ বেদনা বোঝে। আমার অপারগতা দেখে বাবির চোখেই জল ভরে আসে। আমার মন ভোলাতে বলে ওঠে, ‘চলো পাপা, হামলোগ দুসরা বাতে করতে। কই মজাক কি বাত…..’।
বাঙলা কিছু কিছু বুঝতে পারে বাবি। ঘরে তো আমার আর বাবির মার কথোপকথনে প্রায়ই নিজের হিন্দিভাষা নিয়ে ঢুকে পড়ে। মাঝে মাঝে অবাঙালী টানে, কাটা কাটা উচ্চারণে গাইতেও থাকে স্কুলেতে শেখানো বাঙলা গানটা, ‘যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে ….’। কিন্তু বাবি ঠিকঠাক বাঙলাটা জানে না। ওর বন্ধুদের কেউই তো বাঙালী নয়। বাবির বাঙলা না শিখেও তাই দিব্যি চলে যায়।
অনেক চিন্তা করে আমিও দেখেছি, যদি সত্যিই বাঙলা না শেখে বাবি, কি এমন ক্ষতি হতে পারে। ক্যারিয়ার? ভারতীয় কোন ভাষাই তো ক্যারিয়ার গড়ার জন্য জরুরি নয়। শিখতে হবে ইংরেজী। অন্য ভারতীয়দের সঙ্গে কথা বলার জন্য হিন্দিই তো যথেষ্ট। তবে আর বাঙলাটা কেন? আমার তরফ থেকে বাঙলা শেখার জন্য তাই কোন চাপ নেই বাবির ওপর।
বাবির ঠাকুমা এবং বাবি দুজনেই নিরেট হিন্দি এবং বাঙলায় দুজনের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলে। ঠাকুমা ফোনে জিগ্যেস করে। ‘ তুমি কবে আসবে বাবা এখানে’?
‘আভি তো নেহি। আভি মেরা এগজাম হ্যায়। পাপা কো ভি ছুট্টি মিলনা চাহিয়ে’।
‘তাহলে আমাকে আগে থেকে জানিয়ো’।
‘হাঁ ঠিক হ্যায়’।
বৎসরান্তে যখন পশ্চিমবঙ্গমুখো হই, আমার বাড়ির আশপাশের বাচ্চারা , যাদের মাতৃভাষা বাঙলা, তারা তাদের মাতৃভাষা সঙ্গে নিয়ে খেলতে আসে আমার বাবির সঙ্গে।
‘কিরে বাবি, ক্রিকেট খেলবি’?
‘হাঁ, খেলুঙ্গা’।
বাবি কিছুটা হিন্দি, ওরা কিছুটা বাংলা, বাকী ব্যবধান ঘুচিয়ে মাঝখানে সেতু হয়ে দাঁড়ায় সভ্যতার আদিম ভাষা, ইশারা।
বাবিকে আমি ফলসাগাছ দেখাতে নিয়ে গিয়েছিলাম। ফলসা খুব মিষ্টি ফল। নতুনপুকুরের আধখাওয়া পাড় থেকে বেরিয়ে মোটা ডালটা সোজা পুকুরের গভীর জলে এই পড়ে,এই পড়ে। ওই মোটা ডালে একা বসে থাকতে থাকতে একদিন বাস্তুসাপটাকে খোলস ছাড়তে দেখেছিলাম। বাবিকে আমি ফলসাগাছ দেখাতে নিয়ে গেলাম। কিন্তু অনেক চেষ্টা করেও ফলসা, বাস্তুসাপ আর খোলস শব্দের সঠিক অনুবাদ করতে পারলাম না।
সেদিন অনেকক্ষণ বাবি আর আমি ফলসাগাছটার সামনে নির্বাক দাঁড়িয়ে থেকেছিলাম। ফিরে আসতে আসতে শুধু বলেছিলাম, ‘ফলসা বহুত মিঠা ফল’।
আমার প্রতিবন্ধী বন্ধু পলাশ। বয়সে আমারই মতন প্রৌঢ়। মনের বয়সটা দশবছরের বাচ্চার কাছাকাছি রয়ে গেছে। আমি গ্রামে পৌঁছলেই এখনও কোথা থেকে খবর পেয়ে ছুটে আসে দেখা করতে। প্রতিবন্ধী বন্ধু পলাশ। বন্ধুত্বে প্রতিবন্ধকতা নেই কোন। আমাকে দেখেই বলে ওঠে, ‘ এসেছিস’? একগাল হাসি। তারপর আমাকে দেখিয়ে বাবিকে বলে, ‘আমার বন্ধু’। বাবি বলে ‘সমঝা’।
পলাশ আমাকে জিগ্যেস করে ‘ ও কি বলল’?
মা বুঝিয়ে দেয়, ‘আমার বাবি বাঙলা বলতে পারেনা রে পলাশ। ও হিন্দি বলে , হিন্দি’।
পলাশ বাবির দিকে বড় বড় চোখে খানিকক্ষণ চেয়ে থাকে। মনে কিছু চিন্তা করে। তারপর বিজ্ঞের মত বলে, ‘ও বাঙলাটা শিখে যাবে’।  মাথাটা মাটির দিকে নামিয়ে বিড়বিড় করে, ‘না হলে আমি কথাটা বলব কার সঙ্গে’। চোখের নীচ দিয়ে তাকায় আমার দিকে।
আমার শিক্ষকমামা বলেছিলেন, ‘ মাতৃভাষাটা শেখাবি বাবা। বাঙালীর ছেলে হয়ে বাঙলাটা না জানলে ও তো শিকড়হীন হয়ে বড় হবে’।
শিকড়হীন হয়েই তো বড় হচ্ছে। শিকড়েরা যে মাটি আঁকড়েই পড়ে থাকে। শিকড়েরা বেঁচে থাকার তাগিদে অতীতকে আঁকড়ে রয়ে যায় মাটির অনেক নীচে। গভীরে। আর উদ্ভিদ থেকে বৃক্ষ হয়ে যাওয়া বীজটা ক্রমশ ডালপালা ছড়িয়ে ভবিষ্যতের সন্ধানে পাখা মেলে দেয় সূর্যের দিকে। শিকড় আর ডালপালার মধ্যে দূরত্ব বাড়ে। জীবনের সালোকসংশ্লেষ চলতেই থাকে। ডালপালা আরও  ডালপালা ছড়ায়। নতুন ডালপালারা জানতে পারেনা মূল শিকড়ের অস্তিত্ব।
সার্ধ শতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে থিম বানিয়েছিল প্রবাসী বাঙালী দুর্গোৎসব কমিটি। রবীন্দ্রনাথের অঙ্কন, কবিতা, গান আর উধৃতি নিয়ে সেজে উঠেছিল সম্পূর্ণ মণ্ডপ। সঞ্চয়িতা, গীতবিতান, কাদম্বিনী — কি না ছিল সেখানে। এমনকি আমার অতি প্রিয় সহজপাঠ, সেও জায়গা করে নিয়েছিল মণ্ডপে। স্মৃতির সরণি বেয়ে বাবিকে সঙ্গে নিয়ে আমি ভেসে বেড়াচ্ছিলাম ওখানে। শিকড়ের সন্ধানে। কতদিন বাদে দেখা। বিশ্বভারতী প্রকাশনের সেই অবিকল মুদ্রণ। ঠিক যেমন ভাবে ওই শব্দরা আমার স্বপ্নে এসে দাঁড়ায়। আমায় ডাকে। আজ মঙ্গলবার। পাড়ার জঙ্গল সাফ করার দিন। ঘুম ভেঙে উঠে পড়ি। প্রবাসী সকাল দেখে মন খারাপ হয়। মঙ্গলবারটা মঙ্গলবার ঠিকই। কিন্তু এটা প্রবাসী মঙ্গলবার। এখানে জঙ্গল নেই। আমি হাঁটতে হাঁটতে দেখতে থাকি মণ্ডপ। আমি আবারও পড়তে থাকি শিশুপাঠ্য লেখাগুলো। এসব পড়েছি আমি হারিকেনের আলোয়।
হাঁটতে হাঁটতে খুঁজে পেয়ে যাই আমার প্রিয় ছোটনদীটিকে। আমি প্রাণভরে পড়তে থাকি। আমি প্রাণভরে দেখতে থাকি। বাঁকে বাঁকে ধাক্কা খেতে থাকে ছোটনদী। চলতে থাকে। হাঁটুজল ভেঙে নদী পার হই আমি। চিকচিকে বালিতে দাঁড়িয়ে থাকি শিশু আমি। পায়েতে নদীর জলের ঠাণ্ডা স্পর্শ পাই। দূর থেকে ভেসে আসে কোন এক শিশু কণ্ঠ, ‘পাপা, পাপা ….’।
হঠাৎই চটকাটা ভেঙে যায়। সচকিত হয়ে দেখি , আমি নয়, বাবি দাঁড়িয়ে আছে আমাদের ছোটনদীর সামনে। একবার মনে মনে হাসি। বাঙালী পিতার অবাঙালী পুত্র। তাও দাঁড়িয়ে আছে বিখ্যাত একটি বাঙলা কবিতার সামনে।
কি মনে হতে ডিজিটাল ক্যামেরায় কয়েদ করে রাখি দৃশ্যটিকে।
জানি, কোনদিনই বাঙলা শিখবে না বাবি। বাঙলা শেখার দরকারই নেই তো ওর। তবুও মনে আশা, যদি কোন এক ভবিষ্যৎ সকালে পুরনো এ্যালবাম ঘেঁটে বাবি খুঁজে পায় এ ছবিখানি। যদি মনে পড়ে বাবির পিতা বাঙলাভাষায় কথা বলতো। লিখত।
যদি জানতে চায় শিকড়কে…..।  মাতৃভাষাকে।
Advertisements
Comments
  1. […] রঞ্জন চট্টোপাধ্যায় […]

  2. […] মাতৃভাষা-রঞ্জন চট্টোপাধ্যায় […]

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s