মোরগ লড়াই-সুজিত মজুমদার

Posted: October 23, 2014 in ওয়েবজিন, কার্ত্তিক ১৪২১, গল্প

sujit

মোরগ লড়াই

                          (১)
আজ দুদিন পেটে এক কনাও দানা পড়েনি।শুধু বিদ্যাধরীর বুকে ভেসে বেরিয়েছে আর লড়াই শেষে দু-চারটে ভাজা সংগে বেশ কয়েকবার বাটি মেরেছে।এই সময়টাইতো লড়াইয়ের সময়, ঘরে বসে থাকার সময় নেই।আগে যা হোক একটা টান ছিল ঘরের প্রতি।সারাদিন দু-ব্যাগে মোরগ দুটি পুরে এপ্রান্ত ওপ্রান্ত লড়াই করে আরো দু-পাঁচটা মোরগ বগলদাবা করে ফিরেছে।ফেরার পথে পুরাতন হাটে এক্টু গলা ভিজিয়ে গান ভাঁজতে ভাঁজতে গিয়ে দাঁড়াত বউয়ের দুয়ারে।শীতল উত্তুরে বাতাস যত বেশি গায়ে লাগত তত বেশি বউয়ের গাঁ ঘেঁষে বসে সোহাগ করত।সেদিন আর নেই।বউটারে হেদায়েত ভাগ্যে নিল গত সপ্তাহে।তারপর আর ঘরে ফেরা হয়নি।গায়ে একটা চাদর আর কানে কানপট্টি নিয়ে একটা সপ্তা সে পথে পথে  ঘুরেছে, লড়াই করেছে,জিতেছেও।তবে জেতা মোরগ আর বগলদাবা না করে বিলিয়ে দিয়েছে।যেমন আজ-ইতো, যে ব্যাটা মোরগের পায়ে শিকল বেঁধেছে,তারেই তো জিতা মোরগটা দিয়ে দিয়েছে।
আজ আর দাঁড়িয়ে থাকা যাচ্ছে না,শালার শীতটাও পড়েছে বটে।তাছাড়া কতদিন পড়নের কাপড়ও ধোঁয়া হয়নি।বড্ড গন্ধ ছাড়ছে,পাশে আর কেউ দাঁড়াতে চায় না।দূরে গিয়ে দাঁড়াতে বলে সবাই।আজ বাড়িতে ফিরতেই হবে, ভাবতে ভাবতে ভটভটিতে চেপে বসে লখাই।
পৌষমাস চলছে।সন্ধ্যাতেই হাটখোলার দোকানপাট যা ছিল,বন্ধ হয়ে গেছে।নদির ঘাটে নেমে লখা দুদিক দেখে নিল,না কেউ নেই।থাকলেই হাজারো প্রশ্ন–কিরে লখা বউটারে ফির‌্যে লিবি নারে?                                                                                 -বউটারে ধরি রাখতি পারলি নারে তান্দর‌্যা? লোকে ভাগ্যি নিলে?                                                      -তুই ঘরের লড়্যাইটো জিততি পারলি নে?                                                                         ইসব নানান কুথা বুলবে।না, চুপ করি চলি যাওয়াই ভালো ।
পথে চলতে চলতে লখার মনে পরে, গত বছর প্রায় এই সময়ই কুকুরেখালী থেকে ময়নারে সে ভাগিয়ে নিয়ে আসে।সেদিনও চুপচাপ নদীঘাটে নেমেছিল,পাছে লোকে নানা কথা বলে।হাটখোলা পেরতেই আবার এখানেই দাড়্যে ঘরে যাওয়ার আগেই একটুকুন আদর কর‌্যে নিয়েছিল ।তারপর ঘরে যেতেই মা বলল-                                                                                       ই আভাগির বেটিরে কুথ্যে লিয়ে এলি?                                                                                  -তুর বউ লিয়ে এলামরে মা।                                                                                             –বৌর মুহে ছাই।উর মা পারুতি কুনদিন পুষ্য মানে নাই,এ বেটি মানবে কেনে? লখাই হাতে দাঁ নিয়ে ধমক দিয়ে চুপ করিয়ে ছিল মাকে        -চুপ যা বলি দিলাম।উঃ এখন আমার বৌ।                                                                    আর কুথা বাড়ায় নি মা।
আজ চোরের মত ঘরে ঢোকে লখাই।মা দেখেও কিছু বলে না।শুধু এক থালা বাসি ভাত বেড়ে দেয়।চুপচাপ খেয়ে মাচার উপর শুয়ে পরে।  ঠান্ডাটা বেশ পরেছে আজ।ময়নারে বড় মনে আসে লখার।মনে মনেই সে বলে- কেনে গেলি ময়না। ফির‌্যি আয়, আমি সব মানি লুমু।চোখের কোণে গড়িয়ে আসা জল মুছতে মুছতে কখন ঘুমিয়ে যায়,মনে নেই।                                                                                 সকালে লখার মা একা একাই বিড়বিড় করছে-মাগী পল্যাইছে, তুই ব্যাইচ্ছা গ্যেছিসরে লখা।উঠে কামে যা।আমি ইবার তুর লাগি রাঙ্গা একটো বৌ লিয়াসুম।উর মা তিন ভাতার পাল্টাইছে,উ মাগির এক ভাতারে মন উঠবে কেনে?
লখা বুঝল আর ঘরে থাকা যাবে না,মা এখন বকবক-ই কুরবে।বেরিয়ে পরল সে।হাঁটতে হাঁটতে নতুন ইটভাটার সার বাঁধা ঘরগুলোর সামনে এসে অবাক হয়ে যায়।                                                                                            ময়নাইতো? হ্যাঁতো! উইতো হেদায়েত!শালা আমার বৌটারে ভাগ্যে ইটভাটায় লিয়াস্যে।শালিটাও হাস্যে দেখ!।কুত সুহাগ!                              লখাকে দেখে ময়না চট করি ঘরে ঢুকি গেল।হেদায়েত লুংগিটা কোমর অবধি বেঁধে লখার সামনে এসে দাঁড়ায়।                                       -হাঁ করি তাইক্যে কি দেখছিস।                                                                                             – আমার বৌটারে তুই কেন ভাগ্যেছিস?                                                                                       -বেশ করেছি।উ এখন আমার নিকা করা বৌ।তু ফুট যা এখান থিকা।আবার ইদিক পানে চাসতো তুর জান লিব।
লখাই আর কুথা বাড়াই নি।ফিরে এসেছে।লখাই ভাল করিই চেনে ওকে।বৌটাকে এক কোপে দুভাগ করে জেল খেটিছে শালা।লখা ভেবি পাই না,আমার জাতি কেন, মরবিতো তুর জাতে গিয়ে মর, তা না আমার বৌটারে শালা ফুসলিয়ে নিয়ে এয়েছে।হেদায়েত চলে যেতেই লখার মেজাজটা ক্যামন গরম হয়ে উঠেছে।আর দাঁড়িয়ে না থেকে হাটখোলায় এসে পরপর বেশ কয়েকবাটি মেরে নিল।চোখদুটো ক্রমশ রাগে দুঃখে লাল হয়ে উঠল।বাড়ি ফিরে মোরগ দুটি ব্যাগে পুড়ে আবার বেরিয়ে পরল।লখার মা পান্তা বাড়া ফেলে দৌড়ে লখার হাতদুটি ধরে, বলে-তুই আবার কুথা চললি?উ মাগির কুথা ভুলি যা।তুরে আবার বৌ এনি দিব।
লখা পিছন ফিরিও চায় না।হন হন করি এগিয়ে গিয়ে বসে ভটভটিতে।এসময় বিদ্যাধরী খুব শান্ত থাকে।লখার শান্ত বিদ্যাধরীকে একদম ভালো লাগে না। ময়নার মতো চটকদারি বিদ্যাধরীকেই বেশি পছন্দ।ময়নার কথা মনে হতেই তার রাগ আরো বেড়ে উঠে,মাঝিকে তাড়া লাগায় সে-নৌকাডা ছাড়না ছোঁড়া………………………………।
                                        (২)
প্রায় দশদিন লড়াইয়ের মাঠেমাঠে ঘুরে আজ মেটেখালির মাঠে এসেছে লখা।পৌষ-পারবনে এখানে  বিরাট লড়াইয়ের আসর বসে।আসে পাশের বিশ-ত্রিশটা গ্রাম ভেঙ্গে আসে এই লড়াইকে কেন্দ্র করে।লখাই দুটো তেলে ভাজা দিয়ে বাটি দশেক হাড়িঁয়া মেরে এগিয়ে যায় মোরগের জুটি খুঁজতে।আসে পাশের উৎসাহিত চোখ দেখে লখার বেশ ভালো লাগে।গতবার তার মোরগদুটোই বাদশার মতোই লড়াই করে ছিল।সবাই তা্কে বেশ খাতির করেছে।তবুও লখার মনটা বেশি ভাল নেই‌।গতবছরইতো,লড়াই শেষে যখন নেশায় বুঁদ হয়ে কুকরেখালি হয়ে আঁধার পথে ফিরছিল,আচমকাই ময়না তাকে ঝোপের ভিতর টেনে নেয়।কিছু বলার আগেই ময়না তাকে সাপের মতো পেঁচিয়ে ধরে।লখাও মানা করেনি।বেশ ভালোই লাগছিল।সে রাতেই ময়নাকে বাড়িতে নিয়ে আসে।তারপর দিনেমানে কত সোহাগ দুজনে।আচমকা একটা ডাকে সম্বিত ফেরে লখাইয়ের-                                 -কিরে লখা লড়াই কুরবি?ই দেখ শালা আমার মোরগ!রাচীঁর মাল,দুহাজার তাকা দ্যে লি আসছি!
লখার মেজাজ বিগড়ে যায়।ইচ্ছে হয় শালার উপর এক্ষুনি ঝাপ্পি পরি রক্ত খেতি।ভারি তুর রাচীঁর মাল,মুর বৌটারে লিয়ে রাচীঁ দেখাইছিস।তুর রাচীঁর মোরগের ইয়ে,কিন্তু মুখে শুধু বলে-                                                                                         -বাজি খেলবি?                                                                                         -তুই বাজি খেলবি?তুর আছ্যেটা কিরে?                                                                                      –আমার বৌ, তুই লিছিস।বল, জিতলি ফির‌্যে দিবি,বল?                                                                   -আর না জিতলি?                                                                                                  –না জিতলি উ ময়নারে আমি ফিরিও চাব না।                                                                                  -ভেবি দ্যাখ আমার রাচীঁর মোরগ।                                                                                           -হ, ভাবছি, চল।দাঁড়া, আর দুবাটি মেরে নি,আজ লড়াইটো শেষ করতি হবে।
 দু’এর বদলে লখা আরো পাঁচবাটি মারে,আর সবচেয়ে বড় মোরগের মাথাটা একটা বাটির মধ্যে চুবিয়ে নিয়ে বলে-খা শালা, তুই আজ আমার বৌটারে ফির‌্যি এনি দিবি।
টলতে টলতে লখা দু-পায়ের মাটি শক্ত করে উঠি দাঁড়ায়।চারিদিকে লোকে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে।হেদায়েত আর লখার মোরগের পায়ে ছুরি বাঁধাও শেষ।লড়াই এক্ষূনি শুরু হবে।লখা একটা আঙ্গুল তুলে চিৎকার করে বলে                                                                 -হেদা, মনি আছেতো?জিতলি বৌ আমার।                                                                                      -হ, আগে জিতি ল।
লড়াই শুরু হয়েছে।রাচীঁর মোরগটা গলার রগ ফুলিয়ে বাংলা মোরগটাকে তেড়ে আসে,তবু লখাও পিছু হঠে না।সেও তার পা দিয়ে হেদায়েত আঘাত করে বলে ওঠে- ময়নারে ফির‌্যি দে!ই দেখ!মার!মার!শালা হেদারে মার!
সবাই চিৎকার করছে।হেদায়েতের বেশ রক্ত বেরচ্ছে তবু পিছন হটছে না।লখার মোরগটাও যেন লখার মতো নেশায় মেতেছে,আক্রমন করতে করতে থেমে যাচ্ছে,আবার আক্রমন করছে।–এইতো! এইতো! দে ঠুক্যে,দে বুকে।দুহাত মুঠো করে উঠে দাঁড়ায় লখাই, ঠিক তখুনি হেদায়েতের এক পাল্টা মারে লখার মোরগ শুয়ে পরে।গলগল করে রক্ত বেরচ্ছে,কান্নায় মুখ ঢেকে বসে পরল লখা।
হেদায়েত লখার কলার ধরে দাঁড় করায়-মুনে রাখবি, ময়না আর তুর লয়,উ এখন আমার লড়াই কর‌্যা জিতা বৌ।
একটুও নড়তে পারছে না লখা,শুধু ময়নার মুখখানি মনে পরছে।বুকফেটে কান্না আসছে,হাউ হাউ করে কান্নায় মাটিতে আছড়ে পরে।মেটেখালির মাঠ ধীরে ধীরে শুন্য হয়ে, অন্ধকার নেমে আসে।আঁধারে মিলিয়ে যায় লখা।হাতে আর পয়সা নেই।উঠে হাঁটতে হাঁটতে মাঠের কোনে জ্বলতে থাকা কুপির পাশে বসে,বেঁচে থাকা মোরগটা হাড়িঁর পাশে বসে থাকা মহিলার হাতে দিয়ে বলে-ক বাঁটি দিবে?                                                         –লি খায়ে যা,তুর যত ইচ্ছে হয়।
বাটিঁর পর বাটিঁতে তৃষ্ণা মিটিয়ে লখা পায়ে পায়ে কখন ইটভাটায় চলে এসেছে।আর একটু এগিয়ে ময়নাকে সে যে দোরের সামনে দেখেছিল আন্দাজ করে সেখানে আসে।ঘরের মধ্যে কেরসিনের কুপির আলো দেখা যায় আর ফিসফিস কথা।লখা কান পাতে                                              – লখা আর তুর দিকে তাকাবে নারে ময়না পাখি।ব্যাটারে দিয়েছ্যি ক’ঘা।                                                                   –সে তো বুইঝলাম কিন্তু ই পেটে যে উয়ার বীজ বানছে,সে ডারে কি করি?ফেলি দিমু?                                                          –খবরদার!উ কুথা বুলবিনে।গলা টিপি শেষ করি দিমু।ই ইখন আমার ধন,আমি লড়্যে জিতি ইনেছি।
লখা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না।কি এক নেশায় টলতে টলতে ঘাটের দিকে এগিয়ে গেল,সব রাগ কস্ট দুঃখ ভুলে গিয়ে হেদার প্রতি কৃ্তজ্ঞতায় চোখে জল এসে গেল। অন্ধকারে হোঁচট খেতে খেতে নদির বাঁধে উঠে দাঁড়াল।ভরা জোয়ার।বিদ্যাধরীর বুক জলে টইটুম্বর।এপারে আর মাঝি নেই।
                                           -সমাপ্ত-
Advertisements
Comments

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s