শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ- অন্তরা চৌধুরী

Posted: October 23, 2014 in ওয়েবজিন, কার্ত্তিক ১৪২১, সাক্ষাৎকার

antora

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে কিছুক্ষণ

 

শীর্ষেন্দুদার সঙ্গে প্রথম পরিচয় টেলিফোনের মাধ্যমেই। প্রথম বার কথা বলেই খুব ভাল লেগেছিল। সেইসময় ওনার সঙ্গে দেখা করার অনুমতি চেয়ে নিই। জাহিরুল হাসানের ‘সাহিত্যের ইয়ারবুক’ থেকে ওনার ঠিকানা নিয়ে নির্দিষ্ট দিনের অপেক্ষা করতে থাকি।
   ছোটবেলা থেকেই শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাসগুলো পড়েছি। এমনকি পরিণত বয়সে পৌঁছেও ওনার কিশোর উপন্যাস সমান ভাবে আকর্ষণ করেছে। সাহিত্য মানুষের নান্দনিক চেতনার বিকাশ ঘটায়। আর এই কিশোর উপন্যাসগুলো শুধু রসবোধ সম্পন্ন মানুষই তৈরি করতে সাহায্য করেনা। পাশাপাশি একজন আদর্শ মানুষ হিসাবে গড়ে উঠতেও সাহায্য করে। এই উপন্যাসগুলো পড়তে পড়তে একবারো মনে হয়নি যে তিনি এমন একটা কিছু লিখেছেন যা অসঙ্গত। তা খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের কাছে সঙ্গত বলে মনে হয়। তাঁর কিশোর উপন্যাস ফ্যান্সি ও ফ্যান্টাসির সংমিশ্রণ। তিনি শুধু মাত্র ছোটদের জন্য উপন্যাস লিখলেও বড়দের কাছেও সমান ভাবে মনোযোগ দাবী করে। এই কিশোর উপন্যাস সম্পর্কে আরো বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের উদ্দ্যেশ্যেই শীর্ষেন্দুদার একটা সাক্ষাৎকার প্রয়োজন হয়েছিল।
    নির্দিষ্ট দিনে গেলাম যোধপুর পার্কে। অনেক খোঁজার পর তাঁর বাড়িতে গিয়ে পৌঁছলাম। বাড়িতে গিয়ে দেখি প্রচুর লোক। আমাকে সময় দেওয়া ছিল বারোটা থেকে সাড়ে বারোটার মধ্যে। ভাবলাম এই ব্যক্তিগুলিও হয়ত আমার মত শীর্ষেন্দুদার কাছে কোন প্রয়োজনে এসেছে। বেশ কিছুক্ষণ বসে থাকার পর এক ব্যক্তি আমায় জিজ্ঞাসা করলেন-
      ‘ আপনিও কি দীক্ষা নিতে এসেছেন?’
প্রশ্নটা শুনে ধাতস্থ হতে কিছুক্ষণ সময় লাগল। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় শীর্ষেন্দুদার জীবনে ঠাকুর শ্রীশ্রী অনুকূল চন্দ্রের মাহাত্ম্যের কথা শুনেছিলাম। তাই উক্ত ভদ্রলোকের প্রশ্নই আমার সমস্ত কৌতূহলের নিরসন করে। এনারা সকলেই তাহলে শীর্ষেন্দুদার কাছে দীক্ষা নিতে এসেছে। বললাম-
‘ না। আমি ওনার একটা সাক্ষাৎকার নিতে এসেছি।’
পাল্টা প্রশ্ন-‘কোন চ্যানেল বা পত্রিকা থেকে’?
বললাম, আমি কোন চ্যানেল বা পত্রিকা থেকে আসিনি। পুরোটাই ব্যাক্তিগত কাজের জন্য। এমন সময় দেখি শীর্ষেন্দুদা নামছেন ওপর থেকে। প্রথম দর্শনেই আমি অভিভূত। গলায় একটি পাটের জোড়, পরণে লুঙ্গি। করজোড়ে তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। গিয়ে প্রণাম করলাম। উনি আশীর্ব্বাদ করলেন। সেই সময় অত ভিড়ের মধ্যে নিজের পরিচয় দিতে ইচ্ছে হোলনা। যারা দীক্ষা নিতে এসেছিল তাদের সকলকে নিয়েই তিনি পাশে ঠাকুর ঘরে গেলেন। প্রায় একঘণ্টা পর ওনার দীক্ষা দান সম্পূর্ণ হয়। এরপর উনি বৈঠকখানায় এসে বসেন। সকলে ওনাকে আধ্যাত্মিক বিভিন্ন প্রশ্নে জর্জরিত করে। উনি একটুও বিরক্ত না হয়ে সকলের সমস্ত প্রশ্নের উত্তর দেন। কয়েকজন নিজের ব্যাক্তিগত জীবনে মানসিক চাঞ্চল্য নিরসনের উপায় জানতে চাইলে তিনি সকলকেই ইষ্টভীতি করার কথা বলেন। ঠোঁট বন্ধ করে মানসিক জপ করার কথাও বলেন।
        এক মহিলা জানতে চান, বাচ্ছা যখন খুব দুষ্টুমি করে তখন রাগের বশবর্তী হয়ে বাচ্ছার গায়ে হাত তুলতে হয়। কিন্তু এটা কি অন্যায়? এই রাগ কীভাবে প্রশমিত করা যায়? শীর্ষেন্দুদা জানান সন্তানকে শাসন করার মধ্যে কোন অন্যায় নেই। কিন্তু ক্রোধ প্রশমিত করতে হলে শ্রীশ্রী ঠাকুরের কাছে আত্মসমর্পন করতে হবে।
    আমি তখন শুধুই নীরব শ্রোতা। একসময় ওনার সঙ্গে সকলের অনেক ছবিও তোলা হয়। ওনার বাড়ি থেকে সকলকে মিষ্টিমুখ করানো হয়। এরপর ওনার দৃষ্টি পড়ে আমার দিকে। বলেন- “অনেকক্ষণ ধরে তুমি অপেক্ষা করছ। আর একটু বোসো”। যারা এসেছিল সকলকে দরজা থেকে বিদায় জানিয়ে আমার কাছে এসে বসেন। বেশ কিছু বিষয়ে আলোচনার পর আমি ওনার কিশোর উপন্যাসের ওপর প্রশ্ন করতে শুরু করেন।
 প্রঃ ১৯৮০-২০১০ পর্যন্ত যে সমস্ত উপন্যাসগুলি প্রকাশিত হয়েছে সে বিষয়ে আপনার মতামত কি?
 -যারা আমার কিশোর উপন্যাস লিখেছে তারা জানে যে আমি জটিল কোন উপন্যাস লিখিনি। আমি যেটা লিখেছি সেটা মজার। এই উপন্যাসগুলোতে ভূত থাকে, দারোগা থাকে, গ্রাম থাকে। অঞ্চলগুলো সব গ্রাম ভিত্তিক। পরিবেশটা তাতে পাওয়া যায়। দ্বিতীয় কথা গ্রামের লোকগুলো সহজ সরল হয়। শহরের লোকেদের মত এত প্যাঁচাল হয়না। গ্রামের পরিবেশটা আমার ব্যক্তিগত ভাবে ভাল লাগে। শহরের পরিবেশ আছে দু-একটি গল্পে। যেমন ‘বক্সার রতন’। ‘বনি’ উপন্যাসে বিদেশের পটভূমিকা আছে। গ্রামের পরিবেশ নিয়ে লিখতে আমার ভাল লাগে। শহরের পরিবেশ ও আছে দু-একটি উপন্যাসে। বৈশিষ্ট্য যদি বলতো এই। আর বৈশিষ্ট্য আমার মুখ থেকে শুনে বিচার না করাই ভালো। কারণ আমার উপন্যাসের পরিবেশতো অনেকের পছন্দ নাও হতে পারে। সবথেকে বড় বিষয় হল আমি বাচ্ছাদের নিয়ে মজা করতে ভালোবাসি, তাই মজাটাই করি। রসিকতা থাকে, চোর থাকে, ডাকাত থাকে, চোরগুলো আবার ভাল চোরও হয়। ভূতগুলোও ভাল ভূত।
   আমার উপন্যাস ঠিক ভুতের উপন্যাসও নয়। ভূত ও মানুষ মিশিয়েই উপাদান আছে। ভূতকে উপাদান রূপে গ্রহন করার প্রধান কারন হল ভূতকে নিয়ে মজা করা যায়। আবার যেসব কাজ মানুষ করতে পারেনা সেগুলো ভূত করে দেয়।
প্রঃ ১৯৭৮-২০১৪ পর্যন্ত ধারাবাহিক ভাবে যে উপন্যাসগুলো বেরচ্ছে, আপনার কি মনে হয় যে একটা নির্দিষ্ট সময় থেকে সেগুলোর গতি পরিবর্তিত হচ্ছে?
-খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে বলে তো আমার মনে হয়না। মাঝে মাঝে কিছু পরিবর্তন তো আনতেই হয়। যেমন ‘বনি’, ‘বক্সার রতন’।
 প্রঃ চতুর্থ খণ্ডের কিছু উপন্যাসে আগ্নেয় অস্ত্রের ব্যবহার দেখি, সেদিক থেকে কি কিছু পরিবর্তন হিসাবে ধরা যায়?
-আমার লেখায় আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার খুব একটা নেই। বন্দুকের ব্যবহার আগেও ছিল, যেমন ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’তে বন্দুকের ব্যবহার ছিল। বন্দুকের মাধ্যমে খারাপকে খুব একটা দেখাইনা যে সেখান থেকে বিপদ হচ্ছে এরকম কিছু। তাই খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে বলে মনে হয়না। তবে নতুনত্বতো আনতেই হয়।
প্রঃ আপনি কিশোর উপন্যাস লিখেছেন। কিন্তু সেগুলো কি শুধুই কিশোরদের জন্য? সেগুলো কি শুধুই ভূত, শুধুই কল্পবিজ্ঞান, নাকি সেখান থেকে কোন মহত্তর জীবন সত্যে উপনীত হওয়ার কথাও বলেছেন?
-আমার কিশোর উপন্যাস তো কিশোরদের থেকে বড়রাই বেশী পড়ে। হ্যাঁ, কল্পবিজ্ঞান অনেকগুলোই লিখেছি। কল্পবিজ্ঞানের ওপর লেখা বেশ কিছু উপন্যাস আছে। যেমন ‘বনি’, ‘পাতালঘর’ প্রভৃতি। মিলিয়ে মিশিয়ে সবগুলোতেই উপাদান ঘুরে ফিরে এসেছে। আমি যে টানা ভূতের উপন্যাস লিখছি, কি টানা কল্পবিজ্ঞান লিখছি এমন নয়। ভূতের উপন্যাসের মধ্যে কিছুটা বাস্তব, কিছুটা পরাবাস্তব মিশে যাচ্ছে। বেশ একটা পাঁচ মিশেলী ব্যাপার। একই সঙ্গে ভূত আছে, কল্পবিজ্ঞান আছে ছোটদের উপন্যাসে।
      ভালত্বের মহত্ব বা ভালকে জিতিয়ে দেবার একটা প্রবণতা আছে। Good and bad, black and white এর যে পার্থক্য সেভাবেই একটা ব্যাপার চলে আসছে। আমি যখন লিখি তখন অত ভেবে লিখিনা। যা মনে আসে তাই লিখি। আধুনিকতার বিষয়গুলোকে বিচার করে লিখিনা। মূলতঃ অভিজ্ঞতা থেকেই লিখেছি। মনে যা আসে তাই লিখি।
প্রঃ এই উপন্যাস গুলোতে কোন নীতি বোধ সঞ্চারিত করতে চেয়েছেন?
  • থাকে একটা ভালো-মন্দের ব্যাপার থাকে। সেটা পড়লেই বুঝতে পারবে। নীতিবোধ প্রতিটি গল্পেই আছে।
প্রঃ গোয়েন্দা নিয়ে কি লিখেছেন?
-বরদাচরন বলে আমি একটি গোয়েন্দা সৃষ্টি করেছিলাম। কিন্তু তাকে নিয়ে আমি খুব বেশী খেলা করিনি। কারণ প্রাইভেট গোয়েন্দা আমার কাছে খুব ইম্প্র্যাক্টিক্যাল মনে হয়। ‘মনোজদের অদ্ভুত বাড়ি’ উপন্যাসে গোয়েন্দা চরিত্র সৃষ্টি করেছিলাম। পরবর্তীকালে তাকে নিয়ে আর কিছু লিখিনি।
     আমি বললাম আমাকে সময় দেবার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
আমি সাক্ষী হয়ে রইলাম ওই বিরল মুহূর্তের ও দুর্লভ সাক্ষাৎকারের।
                                       সময়- ১.২০-২.00
                                       দিন-১৫.৮.২০১৪শুক্রবার
                                    স্থান- যোধপুর পার্ক, কলকাতা
Advertisements
Comments
  1. পড়ুন খুব ভালো একটি সাক্ষ্যাৎকার ।

  2. অপূর্ব সুন্দর একটা অসাধারণ লেখা আমি খুব আনন্দিত, মুগ্ধ, অনেক শুভেচ্ছা রইলো।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out / Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out / Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out / Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out / Change )

Connecting to %s